চীনে নির্মিত ও চীনা মালিকানাধীন পণ্যবাহী জাহাজের ওপর নতুন করে বন্দর ফি আরোপের পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র্। আগামী অক্টোবর থেকে এ নতুন ফি আরোপ করা হতে পারে। বৈশ্বিক শিপিং খাতে এখন নতুন অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করছে বিষয়টি। এরই মধ্যে চীনে নির্মিত জাহাজনির্ভর বেশকিছু শিপিং কোম্পানি তাদের রুট পুনর্বিন্যাস শুরু করেছে, যাতে এসব জাহাজ যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বাণিজ্যপথ এড়িয়ে চলতে পারে। খবর নিক্কেই এশিয়া।
লন্ডনভিত্তিক নৌপরিবহন বিষয়ক গবেষণা, পরামর্শক ও আর্থিক সেবাদাতা সংস্থা ড্রিউরির তথ্যানুযায়ী, মে মাসের শেষ দিকেও যুক্তরাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রধান তিন বাণিজ্য রুটে প্রায় প্রতি পাঁচ কনটেইনার জাহাজের একটি ছিল চীনে নির্মিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে এ রুটে চলাচলকারী কনটেইনার জাহাজগুলোর মধ্যে প্রতি ২০টির মধ্যে একটিতে নেমে আসতে পারে চীনে নির্মিত পণ্যবাহী নৌযান।
সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিলিপ ডামাসের ভাষ্যানুযায়ী, অক্টোবর যত এগিয়ে আসবে, চীনে নির্মিত জাহাজগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর এড়িয়ে অন্য রুটে যাওয়ার প্রবণতা দ্রুত বাড়বে। তবে সব জাহাজের পক্ষে এড়িয়ে চলা সম্ভব নাও হতে পারে। ওই পরিস্থিতিতে কিছু চীনা জাহাজ তখনো মার্কিন বন্দরে আসবে।
এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পরিবহনে প্রধান তিন বাণিজ্য পথ হলো পশ্চিম, পূর্ব উপকূল ও ট্রান্সআটলান্টিক রুট। এসব রুটে চীনা জাহাজের সংখ্যা মে-জুলাইয়ের মধ্যে ৮ শতাংশ কমেছে।
ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের (ইউএসটিআর) এপ্রিলে দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১৪ অক্টোবর থেকে মার্কিন বন্দরগুলোয় প্রবেশ করলে চীনা মালিকানাধীন বা পরিচালিত জাহাজগুলোকে পরিবাহিত প্রতি টন পণ্যের জন্য ৫০ ডলার ফি পরিশোধ করতে হবে, যা বছরে সর্বোচ্চ পাঁচবার আরোপিত হবে। সেক্ষেত্রে কনটেইনারবাহী একেকটি বড় জাহাজকে অতিরিক্ত কয়েক মিলিয়ন ডলার ফি পরিশোধ করতে হতে পারে। ২০২৮ সালের মধ্যে এ ফি বাড়িয়ে টনপ্রতি ১৮০ ডলারে উন্নীত করা হবে। প্রসঙ্গত, বড় কনটেইনার জাহাজগুলো পুরোপুরি পূর্ণ অবস্থায় কয়েক লাখ টন পর্যন্ত পণ্য পরিবহন করতে পারে।
অন্যদিকে যদি অন্য কোনো দেশের কোম্পানি চীনে নির্মিত জাহাজ ব্যবহার করে, তাদের জন্য শুরুতে ফি হবে টনপ্রতি ১৮ ডলার। কনটেইনারপ্রতি এ ফি হবে ১২০ ডলারে। ২০২৮ সালের মধ্যে এ ফি বাড়িয়ে যথাক্রমে ৩৩ ও ২৫০ ডলারে উন্নীত করা হবে।
চীন-মার্কিন বাণিজ্য বিবাদকে নতুন করে বাড়িয়ে তুলেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। যদিও চীনের জাহাজ শিল্প নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক আগে থেকেই বিতর্ক চলছে। বিগত জো বাইডেন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ২০২৪ সালেই অভিযোগ তুলে দাবি করা হয় হয়েছিল, বৈশ্বিক সামুদ্রিক, লজিস্টিকস ও জাহাজ নির্মাণ খাতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য অন্যায্য নীতি প্রয়োগ করছে চীন।
বিষয়টি গোটা বৈশ্বিক শিপিং খাতকেই চাপে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের পর্যবেক্ষকদের। গত কয়েক দশকে বৈশ্বিক শিপিং খাতে চালকের আসনে উঠে এসেছে চীন। ইউএসটিআরের হিসাব অনুযায়ী, ২০০০ সালে বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পের আকার ছিল ১৫ হাজার কোটি ডলার। সেখানে চীনের অংশীদারত্ব ছিল প্রায় ৫ শতাংশ। বেইজিংয়ের দেয়া ভর্তুকি ও প্রণোদনাকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত সম্প্রসারণ হতে থাকে শিল্পটি। প্রায় দুই যুগের ব্যবধানে ২০২৩ সালের মধ্যেই তা ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে বৈশ্বিক জাহাজ নির্মাণ শিল্পে প্রভাবশালী অবস্থান হারানো মার্কিন শিপইয়ার্ডগুলোর অংশীদারত্ব নেমে আসে ১ শতাংশের নিচে। এ খাতে চীনের পর দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান।
ইউনাইটেড স্টিলওয়ার্কার্স এবং আরো চারটি মার্কিন ট্রেড ইউনিয়নের অনুরোধে গত বছরের এপ্রিলে ট্রেড অ্যাক্ট অব ১৯৭৪-এর সেকশন ৩০১-এর অধীনে বৈশ্বিক শিপিং খাতে চীনা আধিপত্য নিয়ে তদন্ত শুরু করে ইউএসটিআর। এ আইনে বলা হয়েছে, অন্যায্য কার্যক্রম বা মার্কিন বাণিজ্য খাতকে চাপে ফেলা অন্য দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।
চীনসংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর ফি আরোপ সম্পর্কে ইউএসটিআর দাবি করছে, এ ফি আদায়ের প্রয়োজন আছে। এর মাধ্যমে বাণিজ্য খাতে সমতার পরিবেশ তৈরি হবে। কারণ চীনের কার্যক্রম ও রাষ্ট্রীয় নীতি দেশটিকে বিশ্বের বাণিজ্যিক জাহাজ নির্মাণ খাতে প্রাধান্য বিস্তারে সাহায্য করেছে।
চীনে সরকারি সহায়তা পাওয়া শিপিং কোম্পানিগুলোর অন্যতম কসকোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের বৈষম্যমূলক ফির কারণে মার্কিন রুটে সরাসরি কার্যক্রম চালানো লোকসানে রূপ নেবে। সংকট উত্তরণে খাতসংশ্লিষ্ট অংশীদারদের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর কথা ভাবছে চীনা শিপিং কোম্পানিগুলো। কসকো ও এর সহযোগী সংস্থা ওওসিএল শিপিং কোম্পানি বৈশ্বিক শিপিং জায়ান্টদের সংগঠন ওশান অ্যালায়েন্সের সদস্য। ইউরোপের সিএমএ সিজিএম ও তাইওয়ানের এভারগ্রিনও এ সংগঠনের সদস্য হিসেবে রয়েছে।
ফিলিপ ডামাস জানান, সমুদ্রপথে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথটি এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট কোস্ট পর্যন্ত বিস্তৃত। গত মাসের শেষ নাগাদ এ রুটে সিএমএ সিজিএমের কনটেইনার পরিষেবায় চীনে নির্মিত জাহাজের হিস্যা ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ।
তবে এ বাড়তি ফির বোঝা এড়াতে বাণিজ্যপথটির অংশীদারদের মধ্যে কী ধরনের সমঝোতা হতে পারে সে বিষয় এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ জাহাজ পরিবর্তন করে পণ্য পরিবহন কোনো টেকসই সমাধান নয় বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, সব শিপিং কোম্পানির জন্যই নিজের জাহাজ ব্যবহার করা সাশ্রয়ী ও বেশি সুবিধাজনক। এজন্য বিকল্প খোঁজা সহজ নয়।
সেন্টার ফর মেরিটাইম স্ট্র্যাটেজির ননরেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো জন ম্যাককাউনের মতে, এ পরিস্থিতি নিরসনে ওশান অ্যালায়েন্সের সদস্য শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে বোঝাপড়ার শর্ত নির্ধারণ জটিল হবে।
তিনি বলেন, ‘জাহাজ কোম্পানির জন্য সব ফি বহন মারাত্মক হবে। যদি তা চলতে এবং ফি পরিশোধ করতে থাকে, তাহলে অবশ্যই এ ব্যয় গ্রাহকের ওপর চাপানো হবে। আর গ্রাহকের ওপর বাড়তি ব্যয় চাপানো হলে প্রতিযোগিতা সমান অবস্থানে থাকবে না।’
তবে ইউএসটিআর জানিয়েছে, জাহাজ শিল্পের প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতে ফি কাঠামোয় পরিবর্তন আসতে পারে। এছাড়া চীন ও যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বিবাদে বিরতির সময় সম্প্রতি ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় বন্দর ফি দুই দেশের আলোচনার অংশ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইনি সংস্থা রিড স্মিথের বিশেষজ্ঞ লেই হ্যানসনের মতে, নতুন ফি বাস্তবায়নের আগে আরো সংশোধন অস্বাভাবিক কিছু নয়।